হিমোগ্লোবিন কি, এর কাজ ও মানব দেহে এর প্রয়োজন

হিমোগ্লোবিন কি

হিমোগ্লোবিন কি এই প্রশ্নে বলা যায়, হিমোগ্লোবিন একটি অক্সিজেনবাহী লৌহসমৃদ্ধ প্রোটিন যা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের লোহিত কণিকা ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের কলায় পাওয়া যায়। অক্সিজেনযুক্ত অবস্থায় একে বলা হয় অক্সিহিমোগ্লোবিন।

এই হিমোগ্লোবিন রক্তে প্রয়োজনীয় ঘনত্ব বজায় রাখে। মুলত এই কারনেই রক্ত লাল হয়। হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ হল ফুস্ফুস হতে অক্সিজেন রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অংশে প্রবাহিত করে এবং কোষীও ব্যবহারের জন্য অবমুক্ত রাখে।

এটি কোষ হতে কার্বন ডাই অক্সাইড ফুস্ফুসে নিয়ে যায়। প্রতি গ্রাম হিমোগ্লোবিন ১.৩৬ থেকে ১.৩৭ মিলিলিটার অক্সিজেন পরিবহন করতে পারে। তবে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকে। এই পরিমান কমে গেলে রক্ত সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ হতে পারে। 

আজকের আর্টিকেলে হিমোগ্লোবিন কি, এর গুরুত্ব ও হিমোগ্লোবিনের অভাবজনিত রোগগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। 

রক্তে হিমোগ্লোবিনের কাজ

গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হচ্ছে, হিমোগ্লোবিন কি ও এর কাজ কি? হিমোগ্লোবিন রক্তের একটি উপাদান যা বাহক হিসেবে কাজ করে। রক্তের ঘনত্ব বজায় রাখা ও রক্তের লাল হবার পিছনে এই হিমোগ্লোবিনের অবদান রয়েছে। মানবদেহের অস্থিমজ্জা থেকে হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়। 

১। যে অক্সিজেন আমরা গ্রহন করি তা ফুস্ফুসে জমা হয়। পরে এই ফুস্ফুস থেকে হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে দেহের কোষগুলোতে চলে যায়। কোষগুলো শক্তি উৎপাদন শেষে যে কার্বন ডাই অক্সাইড ফুস্ফুসে চলে যায়। ফলে আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারি। 

হিমোগ্লোবিন কি

২। হিমোগ্লোবিন রক্তে কোন দূষিত পদার্থ মিশতে বাধা প্রদান করে ও ক্ষতিকর পদার্থ শরীর থেকে বের করতে সাহায্য করে। 

৩। শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। এই অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করে এই হিমোগ্লোবিন। 

৪। রক্ত কনিকার ৯৬-৯৭% হিমোগ্লোবিনের প্রোটিন অংশ। শরীরে রক্তের মোট ওজনের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিন রক্তে ৩০-১০০ বার অক্সিজেন মুভ করাতে পারে। ফলে ফুসফুসে অক্সিজেনের মাত্রা কম বা বেশি হলে তার পরিমান ঠিক রাখে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিন কি ও এর কাজ কি তা আমরা বুঝতে পারছি।

হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক পরিমান 

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতি ১০০মিলিলিটার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান ১৪.৫ মিলিগ্রাম। 

পুরুষের ক্ষেত্রে 

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে গড় হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে (g/dL) ১৩.৫-১৭.৫ গ্রাম।

নারীর ক্ষেত্রে 

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে গড় হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে (g/dL) ১২-১৫.৫ গ্রাম। 

শিশুদের ক্ষেত্রে 

জন্মের পর লোহিত রক্তকনিকার মাত্রা ছেলে মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে সমান থাকে। ১২ বছরের পর থেকে শিশুদের রক্তে লোহিত রক্তকনিকার পরিমান লিঙ্গ ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থায় 

গর্ভাবস্থায় নারীদের রক্তে লোহিত রক্ত কনিকার ঘনত্ব কম থাকে। কারন এই সময় বাচ্চা তার মায়ের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহন করে। 

গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা – 

ট্রাইমেস্টার = ত্রৈমাসিক

প্রথম ট্রাইমেস্টারঃ ১১.৬ – ১৩.৯ গ্রাম/ডেসিলিটার (g/dL)

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারঃ ৯.৭-১৪.৮ গ্রাম/ডেসিলিটার (g/dL)

তৃতীয় ট্রাইমেস্টারঃ ৯.৫-১৫.০ গ্রাম/ডেসিলিটার (g/dL)

হিমোগ্লোবিন কম হওয়ার কারণ

রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হওয়া একটি সাধারন সমস্যা। যেকোনো কারনেই রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হতে পারে। এক্ষেত্রে বয়স বা লিঙ্গ কোন বিষয় না। নারী বা পুরুষ যেকোনো বয়সে এই সমস্যা হতে পারে।

শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হলে বা চাহিদা অনুযায়ী ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি হলে হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে। কোন কঠিন অসুখ হলেও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমতে পারে। 

হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হবার কিছু কারন উল্লেখ করা হল – 

১। ক্যান্সার

২। লিউকমিয়া

৩। লিম্ফমা 

৪। সিরোসিস 

৫। আয়রনের অভাব

৬। ক্ষত থেকে রক্তপাত

৭। নিয়মিত রক্তদাতা

৮। পেটের আলসার

৯। পেটের ক্যান্সার

১০। অর্শরোগ

১১। হাইপোথাইরয়েডিজম

১২। হেমোলাইটিস

১৩। মূত্রাশয় থেকে রক্তপাত

১৪। ভিটামিনের অভাব

হিমোগ্লোবিনের ঘাটতিজনিত লক্ষণ 

শরীরে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হলে কিছু শারীরিক লক্ষণ দেখা যায়। তার মধ্যে কিছু হল-

১। শরীরে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হলে চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। এমনকি মুখ, ঠোঁট, দাড়ি, চোখের পাতা ও নখও ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

২। আয়রনের ঘাটতি হলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। ফলে হৃদরোগের ঝুকি বেড়ে যায়। 

৩। হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হলে কোষগুলোতে অক্সিজেনের পরিমান কমে যায়। ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পড়া ও নখ ভেঙ্গে যাওয়া এই সমস্যা হতে পারে। 

৪। হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হলে শরীরে ক্লান্তিবোধ হতে পারে।

নারীদের হিমোগ্লোবিন ঘাটতির কারন 

নারীদের হিমোগ্লোবিন ঘাটতির অন্যতম কারন হচ্ছে – ঋতুস্রাব ও গর্ভাবস্থা চলাকালীন সময়। প্রতিমাসেই ঋতুস্রাবের কারনে নারীদের শরীর থেকে অধিক পরিমান রক্ত বেরিয়ে যায়। কখনো এই সময় লম্বা হতে পারে। ফলে রক্তক্ষরণে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। মুলত ঋতুস্রাব, মাতৃদুগ্ধ উৎপাদন ও গর্ভধারণের কারনে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। 

হিমোগ্লোবিন যুক্ত খাবার তালিকা  

 ১। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার 

আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে কলিজা, ডিম, লাল মাংস, পালংশাক, আপেল, ডালিম, বেদানা, তরমুজ, কিসমিস, আমন্ড,, শতমূলী, খেজুর, জলপাই, কুমড়ার বিচি, আখরোট, আমলকী, অ্যাপ্রিকট, কাজু অন্যতম।

২। ভিটামিন সি 

ভিটামিন সি ছাড়া আয়রন পুরোপুরি শোষণ হয় না। ভিটামিন সি জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে কমলা, পেঁপে, লেবু, স্ট্রবেরি, গোলমরিচ, ব্রোকলি, ফুলকপি, আঙ্গুর, টমেটো, মরিচ। 

৩। ফলিক অ্যাসিড

ফলিক অ্যাসিড হচ্ছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। এটি লাল রক্তকণিকা তৈরির একটি উপাদান। ফলিক অ্যাসিড যুক্ত খাবারের মধ্যে আছে সবুজ পাতাযুক্ত সবজি, ভাত, কলিজা, শিমের বিচি, কলা, বাদাম, ব্রোকলি। 

৪। ডার্ক চকলেট 

এই চকলেটে শর্করার পরিমান অনেক কম। এটা খেলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি কমে। তাই হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি দূর করতে ডার্ক চকলেট অনেক উপকারী। 

৫। সামুদ্রিক মাছ 

সামুদ্রিক মাছেও আয়রনের মাত্রা বেশি থাকে। চিংড়ি, পমফ্রেটের মত মাছ রক্তে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। 

৬। ক্যাফেইন

ক্যাফেইন যুক্ত খাবার যেমন চা, কফি বেশি খাবেন। কারন ক্যাফেইন হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।   

পরিশেষে 

হিমোগ্লোবিন মানব শরীরের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এই উপাদান রক্তের জন্য যেমন জরুরী তেমন শরীরের চালিকাশক্তি অক্সিজেন প্রবাহেও অবদান রাখে। তাই শরীরে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি দেখা দিলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া জরুরী। আজকে হিমোগ্লোবিন কি ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য দেয়া হয়েছে। আশা করছি আপনাদের উপকারে আসবে। 

হিমোগ্লোবিন সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর / FAQ

১। হিমোগ্লোবিন কত থাকা উচিত?

উত্তরঃ পুরুষের দেহে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ১৩.৫ থেকে ১৭.৫ গ্রাম। নারীদের রক্তে ১২-১৫.৫/১৬ গ্রাম।

২। হিমোগ্লোবিন কত হলে রক্ত দেওয়া যায়?

উত্তরঃ স্বাভাবিক মাত্রার থেকে বেশি পরিমানে কম হলে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়ে।

৩। রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বেশি হলে কি হয়?

উত্তরঃ হিমোগ্লোবিন বেড়ে গেলে রক্ত ঘন হয়ে যায়। ছোট ছোট রক্তের ডেলা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে।

আরও পড়ুন –

রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধির ঔষধ, কার্যকারিতা ও নিয়ম

Leave a Comment