থাইরয়েড এর লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার

থাইরয়েড এর লক্ষণ

থাইরয়েড গ্রন্থি হ’ল এমন একটি গ্রন্থি যা আপনার ঘাড়ের আশপাশে অবস্থিত থাকে এবং হরমোন উৎপাদন এবং নির্গত করে, যা মানুষের শারীরিক কাজ নির্দিষ্ট করে। এটি মানব শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে যা গ্রন্থি হরমোন উৎপাদন এবং নির্গত করে।

যদি গ্রন্থিটি স্বাভাবিকভাবে কাজ না করে, তবে এটি আপনার সম্পূর্ণ শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে। যখন শরীর অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করে, তখন এটি হাইপারথাইরয়েডিজম নামে পরিচিত অবস্থার কারণ হতে পারে।

শরীরে প্রয়োজনীয় থাইরয়েড হরমোন যদি পর্যাপ্ত না হয়, তবে একজন হাইপোথাইরয়েডিজমে ভোগে পড়তে পারেন। এই দুটি রোগ গুরুতর এবং থাইরয়েড চিকিৎসা গ্রহণের জন্য একজন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। আজকের আর্টিকেলে থাইরয়েড এর লক্ষণ, থাইরয়েড কেন হয়, থাউরয়েড এর চিকিৎসা ইত্যাদি বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আরও পড়ুনঃ- মিনি স্ট্রোক এর লক্ষণ, এর প্রতিকার ও করনীয়

গলায় থাইরয়েড এর লক্ষণ

থাইরয়েড এর লক্ষণ thyroid lokkhon

বিভিন্ন কারণে থাইরয়েড হয়ে থাকে। থাইরয়েড এর লক্ষণ গুলো আলোচনা করা হলো-

ওজন বেড়ে যাওয়া

অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া থাইরয়েডের লক্ষণ হতে পারে। শরীরের বিপাকের মাত্রা যদি কমে যায় বা বেড়ে যায়, তার সঙ্গে আপনার শরীরের ক্যালরি এর মাত্রা পরিবর্তন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, যার জন্য আপনার ওজ্ন বাড়তে পারে।

সবসময় ক্লান্তি অনুভূত হওয়া

থাইরয়েড হরমোন মূলত শরীরে শক্তি জোগান দেয়। আর থাইরয়েডের সব থেকে সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে ক্লান্তি। আপনি যদি অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন, তাহলে তা থাইরয়েড সমস্যার সংকেত হতেই পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য 

বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের উপসর্গ। থাইরয়েড হরমোন আপনার ডাইজেস্টিভ ট্র্যাককে চালু রাখতে ভূমিকা পালন করে। আপনার খুব সামান্য থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন হলে আপনার মল বাধাপ্রাপ্ত হবে।

অপরদিকে, ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। আপনি নিয়মিত মলত্যাগ করবেন ঠিকই  কিন্তু সবকিছু দ্রুত চলাচলের কারণে বারবার মলত্যাগ হতে পারে, কিন্তু এটি ডায়রিয়া নয়।

মনোযোগ দিতে না পারা এবং ভুলে যাওয়া

থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন এমন অনেকেই মানসিক ক্লান্তির কথা বলেন। থাইরয়েডের ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত লক্ষণ হল মনোযোগ দিতে না পারা বা সহজেই কোন কথা ভুলে যাওয়া।

অবসন্নতা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে  থাইরয়েডে আক্রান্ত মানুষজন অবসাদে বেশি ভুগছেন। তাই অধিকাংশ মানুষ যাঁরা থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা অবসাদের কবলে পড়ে যেতে পারেন। 

ঘুমের পরিবর্তন

আপনার ঘুম খুব ভাল হত। কিন্তু হঠাৎ অনিদ্রার সমস্যায় জর্জরিত হয়েছেন। এটিও থাইরয়েড হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা

বেশি শীত না পড়লেও যদি আপনার খুব সহজেই ঠান্ডা লাগে, তার মানে আপনার শরীর যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালরি ঝরাচ্ছে না। বরং আপনার শরীর ক্যালরি সঞ্চয় করে রাখছে। যা থাইরয়েড হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

পেশি এবং জয়েন্টে দুর্বলতা ও যন্ত্রনা

বিপাকের সমস্যার কারণে আপনার পেশির এবং জয়েন্টের শক্তির ক্ষয় হতে পারে। এজন্য আপনার পেশি বা জয়েন্ট দুর্বল হয়ে যেতেই পারে।

চুল পড়া

চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই থাইরয়েডজনিত সমস্যা দায়ী। থাইরয়েডের সমস্যা হলে আপনার চুল ঝরা বেড়ে যেতে পারে।

ঋতুস্রাবের সমস্যা

শরীরের অন্যান্য হরমোনের সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের সম্পর্ক থাকায়, সেই হরমোনের বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া অন্যান্য হরমোনের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ঋতুস্রাব জড়িত হরমোনের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে ঋতুস্রাবের সময় সংক্রান্ত তীব্র সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিনা শ্রমে হার্ট প্যালপিটেশন

অত্যধিক থাইরয়েড হরমোন আপনার শরীরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। বিশ্রামে থাকলেও হার্ট প্যালপিটেশন বা বুক ধড়ফড় অনুভব করবেন।

বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভপাত

যেসব নারীরা বন্ধ্যাত্বের ফ্যামিলি হিস্ট্রি ছাড়া কনসিভ করতে সমস্যায় পড়ে যান অথবা যাদের প্রেগন্যান্সির প্রাথমিক পর্যায়ে মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত হয়ে যায় তাদের থাইরয়েড স্ক্রিনিং করানো উচিত। নিম্ন হরমোন মাত্রা ওডিউলেশন এবং প্রিডিস্পোজকে প্রভাবিত করে বন্ধ্যাত্ব বা অকাল গর্ভপাত ঘটায়। যদি আপনার থাইরয়েড রোগ থাকে, তাহলে কনসিভের চেষ্টা এবং প্রেগন্যান্সির সময় হরমোন সাপ্লিমেন্টেশন খুব উপকারে আসতে পারে।

শিশুর বিকাশ বিলম্বিত হওয়া

থাইরয়েড হরমোন প্রায়শই শিশুদের মাঝে নীরবে পরিলক্ষিত হয়ো। কারণ শিশুরা সবসময় তাদের উপসর্গ প্রকাশ করতে পারে না। যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে তারা তাদের সমবয়সীদের তুলনায় ধীরে বেড়ে ওঠছে কিংবা যদি তারা পেশী ব্যথার অভিযোগ করে অথবা যদি শিক্ষকরা বলে তারা ভীত এবং অমনোযোগী তাহলে তা হতে পারে নিম্ন হরমোন মাত্রার লক্ষণ যা তাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

থাইরয়েড কি

থাইরয়েড এর লক্ষণ সম্পর্কে জানার পূর্বে থাইরয়েড কি জানতে হবে। সহজ করে বলতে গেলে, থাইরয়েড হলো গলার দুই পাশে থাকা প্রজাপতি আকৃতির একটি বিশেষ গ্রন্থি।  এই গ্রন্থির কাজ হলো আমাদের শরীরের কিছু অত্যাবশ্যকীয় হরমোন (থাইরয়েড হরমোন) উৎপাদন করা। 

শরীরের জন্য এ থাইরয়েড হরমোনের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে কম বা বেশি হরমোন উৎপাদিত হলেই শরীরের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিসম এবং বেশি উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিসম।

থাইরয়েড হরমোন মূলত বিপাকের ক্ষেত্রে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের গঠনের জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ। কিন্তু এই হরমোনের মাত্রা শরীরে অত্যধিক বেশি বা কম হয়ে গেলে তা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে।

থাইরয়েড হওয়ার কারণ

থাইরয়েডের সমস্যা হওয়ার সবচেয়ে যে বিশেষ কারণ সেটি হল আয়োডিনের অভাব। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন না গেলে এই রোগের সমস্যাটি দেখা দিতে পারে। লবণ শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হলেও এটি থাইরয়েড সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে যেহেতু এরমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন রয়েছে।

থাইরয়েড এর লক্ষণ থাইরয়েড সমস্যার উপসর্গ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। তবুও আপনার শরীরে থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিয়েছে কী না তা বুঝার জন্য বেশ কিছু থাইরয়েড এর লক্ষণ প্রদর্শিত হয়।

থাইরয়েড রোগ নির্ণয়

রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিত্সার ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং পরীক্ষার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলির মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা (TSH, T3, T4), আল্ট্রাসাউন্ড বা থাইরয়েড স্ক্যানের মতো ইমেজিং পরীক্ষা এবং কখনও কখনও থাইরয়েড নোডুলসের বায়োপসি পরিমাপ করার জন্য রক্ত ​​পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা রোগের ধরণ এবং তীব্রতার উপর নির্ভর করে।

ওষুধ

  • হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য, থাইরয়েড হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি সাধারণত ব্যবহার করা হয়। এই চিকিৎসায় সিন্থেটিক থাইরয়েড হরমোন, যেমন লিভোথাইরোক্সিন (Levothyroxine) বা লিওট্রাইথাইরোনিন (Liotrithronine) গ্রহণ করা জড়িত।
  • হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য, অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ওষুধগুলি থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারা উৎপাদিত থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে।
  • থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহের জন্য, প্রদাহ কমাতে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

আয়োডিন থেরাপি

কিছু ধরণের হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য, আয়োডিন থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। এই চিকিৎসায় থাইরয়েড গ্রন্থিকে বন্ধ করতে উচ্চ মাত্রার আয়োডিন দেওয়া জড়িত।

অস্ত্রোপচার

কিছু ক্ষেত্রে, থাইরয়েড গ্রন্থির অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। এটি সাধারণত গ্রন্থিটি ক্যান্সারযুক্ত হলে বা অন্যান্য চিকিৎসায় সাড়া না দিলে করা হয়।

জীবনধারা পরিবর্তন

আপনার থাইরয়েড রোগ পরিচালনা করতে না পারে তার জন্য, আপনি কিছু জীবনধারা পরিবর্তন করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
আপনার জন্য কোন চিকিৎসা সঠিক তা নির্ধারণ করতে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে

প্রিয় পাঠক আশা করি আপনি থাইরয়েড সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। আজ আমরা থাইরয়েড কি? থাইরয়েড কেন হয়? থাইরয়েড এর লক্ষণ সম্পর্কে বেশ কিছু আলোচনা  সম্পর্কে জানলাম। আপনি যদি এই সম্পর্কের না জেনে থাকেন তাহলে অবশ্যই ভাল হবে জেনে নিন। কারণ থাইরয়েড একটি মারাত্বক রোগ।

যা ধীরে ধীরে গুরুত্বর পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে। আশা করি আমাদের এই আলোচনার মাধ্যমে থাইরয়েড সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝতে পেরেছেন। ধন্যবাদ।  

থাইরয়েড এর লক্ষণ সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর / FAQ

১। থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা কত?

উত্তরঃ থাইরয়েড পরীক্ষা বা TSH পরীক্ষার জন্য স্বাভাবিক মাত্রা:

  • প্রথম ত্রৈমাসিক: 0.3-5 mIU/L.
  • দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক: 0.3-6 mIU/L.
  • তৃতীয় ত্রৈমাসিক: 0.7-2 mIU/L.

২। থাইরয়েড হলে কি মোটা হয়?

উত্তরঃ থাইরয়েড হলে বিপাকীয় হার কিছুটা কমে যায়। ফলে হজমের গন্ডগোলের মতো কিছু কারণে ওজন বাড়তে থাকে। থাইরয়েডে ভুগলে ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু একেবারে অসম্ভবও নয় তা। কয়েকটি উপায় মেনে চললে থাইরয়েড থাকা সত্ত্বেও ওজন কমানো সহজ হয়ে যায়।

৩। থাইরয়েডের কোন সমস্যায় ওজন কমে?

উত্তরঃ হাইপারথাইরয়েডিজম ঘটে যখন থাইরয়েড গ্রন্থি খুব বেশি থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে। এই অবস্থাকে ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডও বলা হয়। হাইপারথাইরয়েডিজম শরীরের মেটাবলিজমকে ত্বরান্বিত করে। এটি অনেক উপসর্গের কারণ হতে পারে, যেমন ওজন হ্রাস, হাত কাঁপুনি এবং দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন।

আরও পড়ুন-

থাইরয়েড হলে কি কি সমস্যা হয়

Leave a Comment