থাইরয়েড এর লক্ষণ ও প্রতিকার

থাইরয়েড এর লক্ষণ

থাইরয়েড এর লক্ষণ জানার পূর্বে আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে থাইরয়েড কি? এবং কেন হয়? পৃথিবীতে থাইরয়েডজনিত সমস্যায় ভোগেন অন্তত ১২ শতাংশ মানুষ । থাইরয়েডের সমস্যা একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং পরিচিত রোগ। অধিকাংশ সময় থাইরয়েডে মহিলারা বেশি আক্রান্ত হলেও মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা বহু মানুষের শরীরে দেখা দেয়।

থাইরয়েড কি

সহজ করে বলতে গেলে, থাইরয়েড হলো গলার দুই পাশে থাকা প্রজাপতি আকৃতির একটি বিশেষ গ্রন্থি।  এই গ্রন্থির কাজ হলো আমাদের শরীরের কিছু অত্যাবশ্যকীয় হরমোন (থাইরয়েড হরমোন) উৎপাদন করা। 

শরীরের জন্য এ থাইরয়েড হরমোনের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে কম বা বেশি হরমোন উৎপাদিত হলেই শরীরের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিসম এবং বেশি উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিসম।

থাইরয়েড হরমোন মূলত বিপাকের ক্ষেত্রে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের গঠনের জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ। কিন্তু এই হরমোনের মাত্রা শরীরে অত্যধিক বেশি বা কম হয়ে গেলে তা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে।

থাইরয়েড হওয়ার কারণ

থাইরয়েডের সমস্যা হওয়ার সবচেয়ে যে বিশেষ কারণ সেটি হল আয়োডিনের অভাব। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন না গেলে এই রোগের সমস্যাটি দেখা দিতে পারে। লবণ শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হলেও এটি থাইরয়েড সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে যেহেতু এরমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়োডিন রয়েছে।

থাইরয়েড এর লক্ষণ থাইরয়েড সমস্যার উপসর্গ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। তবুও আপনার শরীরে থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিয়েছে কী না তা বুঝার জন্য বেশ কিছু লক্ষণ প্রদর্শিত হয়।

থাইরয়েড এর লক্ষণ সমুহ

ওজন বেড়ে যাওয়া

অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া থাইরয়েডের লক্ষণ হতে পারে। শরীরের বিপাকের মাত্রা যদি কমে যায় বা বেড়ে যায়, তার সঙ্গে আপনার শরীরের ক্যালরি এর মাত্রা পরিবর্তন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, যার জন্য আপনার ওজ্ন বাড়তে পারে।

সবসময় ক্লান্তি অনুভূত হওয়া

থাইরয়েড হরমোন মূলত শরীরে শক্তি জোগান দেয়। আর থাইরয়েডের সব থেকে সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে ক্লান্তি। আপনি যদি অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন, তাহলে তা থাইরয়েড সমস্যার সংকেত হতেই পারে।

আরও পড়ুনঃ হার্টের সমস্যার লক্ষণ ও প্রতিকার

কোষ্ঠকাঠিন্য 

বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের উপসর্গ। থাইরয়েড হরমোন আপনার ডাইজেস্টিভ ট্র্যাককে চালু রাখতে ভূমিকা পালন করে। আপনার খুব সামান্য থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন হলে আপনার মল বাধাপ্রাপ্ত হবে।

অপরদিকে, ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। আপনি নিয়মিত মলত্যাগ করবেন ঠিকই  কিন্তু সবকিছু দ্রুত চলাচলের কারণে বারবার মলত্যাগ হতে পারে, কিন্তু এটি ডায়রিয়া নয়।

মনোযোগ দিতে না পারা এবং ভুলে যাওয়া

থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন এমন অনেকেই মানসিক ক্লান্তির কথা বলেন। থাইরয়েডের ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত লক্ষণ হল মনোযোগ দিতে না পারা বা সহজেই কোন কথা ভুলে যাওয়া।

অবসন্নতা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে  থাইরয়েডে আক্রান্ত মানুষজন অবসাদে বেশি ভুগছেন। তাই অধিকাংশ মানুষ যাঁরা থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা অবসাদের কবলে পড়ে যেতে পারেন। 

ঘুমের পরিবর্তন

আপনার ঘুম খুব ভাল হত। কিন্তু হঠাৎ অনিদ্রার সমস্যায় জর্জরিত হয়েছেন। এটিও থাইরয়েড হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা

বেশি শীত না পড়লেও যদি আপনার খুব সহজেই ঠান্ডা লাগে, তার মানে আপনার শরীর যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালরি ঝরাচ্ছে না। বরং আপনার শরীর ক্যালরি সঞ্চয় করে রাখছে। যা থাইরয়েড হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

পেশি এবং জয়েন্টে দুর্বলতা ও যন্ত্রনা

বিপাকের সমস্যার কারণে আপনার পেশির এবং জয়েন্টের শক্তির ক্ষয় হতে পারে। এজন্য আপনার পেশি বা জয়েন্ট দুর্বল হয়ে যেতেই পারে।

চুল পড়া

চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই থাইরয়েডজনিত সমস্যা দায়ী। থাইরয়েডের সমস্যা হলে আপনার চুল ঝরা বেড়ে যেতে পারে।

ঋতুস্রাবের সমস্যা

শরীরের অন্যান্য হরমোনের সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের সম্পর্ক থাকায়, সেই হরমোনের বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া অন্যান্য হরমোনের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ঋতুস্রাব জড়িত হরমোনের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে ঋতুস্রাবের সময় সংক্রান্ত তীব্র সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিনা শ্রমে হার্ট প্যালপিটেশন

অত্যধিক থাইরয়েড হরমোন আপনার শরীরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। বিশ্রামে থাকলেও হার্ট প্যালপিটেশন বা বুক ধড়ফড় অনুভব করবেন।

বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভপাত

যেসব নারীরা বন্ধ্যাত্বের ফ্যামিলি হিস্ট্রি ছাড়া কনসিভ করতে সমস্যায় পড়ে যান অথবা যাদের প্রেগন্যান্সির প্রাথমিক পর্যায়ে মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত হয়ে যায় তাদের থাইরয়েড স্ক্রিনিং করানো উচিত। নিম্ন হরমোন মাত্রা ওডিউলেশন এবং প্রিডিস্পোজকে প্রভাবিত করে বন্ধ্যাত্ব বা অকাল গর্ভপাত ঘটায়। যদি আপনার থাইরয়েড রোগ থাকে, তাহলে কনসিভের চেষ্টা এবং প্রেগন্যান্সির সময় হরমোন সাপ্লিমেন্টেশন খুব উপকারে আসতে পারে।

শিশুর বিকাশ বিলম্বিত হওয়া

থাইরয়েড হরমোন প্রায়শই শিশুদের মাঝে নীরবে পরিলক্ষিত হয়ো। কারণ শিশুরা সবসময় তাদের উপসর্গ প্রকাশ করতে পারে না। যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে তারা তাদের সমবয়সীদের তুলনায় ধীরে বেড়ে ওঠছে কিংবা যদি তারা পেশী ব্যথার অভিযোগ করে অথবা যদি শিক্ষকরা বলে তারা ভীত এবং অমনোযোগী তাহলে তা হতে পারে নিম্ন হরমোন মাত্রার লক্ষণ যা তাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আরও পড়ুনঃ অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম

থাইরয়েড থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়

  • যেহেতু থাইরয়েড রোগীদের আয়োডিনজনিত কারণে হয়ে থাকে সেই জন্য আয়োডিনযুক্ত খাবারগুলি অতিরিক্ত পরিমাণে আপনাকে খেতে হবে। যেমনঃ গাজর, দুধ, সামুদ্রিক মাছ, শাকসবজি এবং মৌসুমি ফলগুলিতেও প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে।
  • থাইরয়েডকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে প্রোটিনের পরিমান খুব বেশি থাকতে হবে। সেই জন্য খাবারে নিয়মিত মুরগির মাংস, ডিম, পনির খেলে থাইরয়েড অনেকটা নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবেন।
  • থাইরয়েড সমস্যার মোকাবেলা করতে হলে আপনার ঘুমের খুবই প্রয়োজন। সেই জন্য যারা রাত জেগে থাকে তাদের এই সমস্যা বেড়ে যাওয়ার বেশি আশঙ্কা দেখা যায়। যারা রাতে কাজ করেন, তারা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণ করে নিবেন।
  • থাইরয়েডের সমস্যা হলে আমরা চিন্তায় পড়ে যায় কিভাবে এই অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে এই সময় নিজেকে শরীরচর্চা থেকে দূরে রাখা যাবে না। নিয়মিত কিছু সময় সাইকেল চালানো কিংবা সাঁতার কাটতে পারেন।

শেষ কথা

প্রিয় পাঠক আশা করি আপনি থাইরয়েড সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। আজ আমরা থাইরয়েড কি? থাইরয়েড কেন হয়? থাইরয়েড এর লক্ষণ সম্পর্কে বেশ কিছু আলোচনা  সম্পর্কে জানলাম। আপনি যদি এই সম্পর্কের না জেনে থাকেন তাহলে অবশ্যই ভাল হবে জেনে নিন। কারণ থাইরয়েড একটি খারাপ রোগ।

তাই থাইরয়েড জানতে সম্পুর্ন পোস্ট মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আমাদের এই আলোচনা থেকে আপনাদের থাইরয়েড সম্পর্কে ধারণা পরিস্কার হবে। আপনার সুস্থতা কামনা করে আজকের মত এখানেই শেষ করছি ধন্যবাদ।  

আরও পড়ুন-

থাইরয়েড হলে কি কি সমস্যা হয়

থাইরয়েড কমানোর উপায়

Leave a Comment