থাইরয়েড কমানোর উপায় ও রোগের ঔষধসমূহ

থাইরয়েড কমানোর উপায়

যারা দীর্ঘদিন থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন তারা ওষুধের পাশাপাশি থাইরয়েড কমানোর উপায় হিসেবে ঘরোয়া পদ্ধতি গুলো  অনুসরণ করতে পারেনথাইরয়েড বর্তমান সমাজে প্রচলিত রোগ গুলির মধ্যে  অসাধারণ একটি পরিচিত রোগ। এটি একটি গ্রন্থি বা হরমোন জনিত রোগ।

মানুষের শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতোই হরমোন সমানভাবে থাকে কিন্তু যখনই হরমোন গ্রন্থি বেড়ে যায় তখনই আমরা এটিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করি থাইরয়েড রোগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলারা আক্রান্ত হলেও বর্তমানে পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে উভয়েই এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বিশেষত শরীরে থাইরয়েড গ্রন্থি থাইরয়েড হরমোনের সৃষ্টি করে তখন  এর পরিমাণ প্রয়োজনের থেকে কম বা বেশি  হওয়াতেই এর রোগ সমস্যা সৃষ্টি করে

 এক গবেষণায় দেখা গেছে থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের দিকে অবস্থিত এবং এটি দেখতে কিছুটা প্রজাপতির মত যা শ্বাসনালিকে পেঁচিয়ে থাকে, যদিও বা এটি একটি ছোট্ট গ্রন্থি তারপরও মানবদেহে এর কার্যকারিতা প্রভাব অনেক আজকের আর্টিকেলে থাইরয়েড কমানোর উপায়, থাইরয়েডের লক্ষন সমূহ, থাইরয়েড রোগের ঔষধ ইত্যাদি বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

হাইপার থাইরয়েড কমানোর উপায়

থাইরয়েড কমানোর ঘরোয়া উপায় thyroid komanor upay
থাইরয়েড কমানোর উপায়

হাইপার থাইরয়েড কমানোর উপায় নিম্নলিখিত।

  • অ্যান্টি-থাইরয়েড ওষুধ: এই ওষুধগুলি থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারা উৎপাদিত থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে।
  • আয়োডিন রেডিওঅ্যাকটিভ থেরাপি: এই চিকিৎসায় থাইরয়েড গ্রন্থিকে ধ্বংস করার জন্য একটি তেজষ্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করা হয়।
  • শল্যচিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে, থাইরয়েড গ্রন্থির একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করার জন্য শল্যচিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

জীবনধারার পরিবর্তন

কিছু জীবনধারার পরিবর্তন হাইপার থাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে:

  • স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ: একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য যা ফল, শাকসবজি, এবং গোটা শস্য সমৃদ্ধ তা নিশ্চিত করে যে আপনি প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছেন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত ব্যায়াম আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হাইপার থাইরয়েডিজমের কিছু লক্ষণ, যেমন ক্লান্তি এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতি রাতে ৭-৮ ঘন্টা ঘুম পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
  • স্ট্রেস কমানো: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হাইপার থাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলিকে আরও খারাপ করতে পারে। যোগব্যায়াম, ধ্যান বা গভীর শ্বাসের ব্যায়ামের মতো কৌশলগুলি অনুশীলন করে আপনি স্ট্রেস কমাতে পারেন।
  • ধূমপান পরিহার: ধূমপান হাইপার থাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলিকে আরও খারাপ করতে পারে এবং এটি অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
  • মদ্যপান সীমিত করা: অতিরিক্ত মদ্যপান হাইপার থাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলিকে আরও খারাপ করতে পারে।

থাইরয়েডের লক্ষন সমূহ

থাইরয়েড কমানোর উপায় জানার আগে লক্ষণ সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। আপনার শরীরে থাইরয়েড সমস্যা দেখা দিয়েছে কিনা তা জানার জন্য নিচে  আটটি লক্ষণের দিকে নজর রাখুন। এবং এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে আপনার এখনই সতর্ক হওয়া উচিত।

  • হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া।
  • প্রচন্ড ক্লান্তি অনুভব করা।
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা।
  • পেশী এবং  হাড়ের জয়েন্ট দুর্বলতা এবং যন্ত্রণা অনুভব করা।
  • অতিরিক্ত মাত্রায় চুল পড়ে যাওয়া।
  • অবসন্নতা।
  • মনোযোগ দিতে না পারা বা ভুলে যাওয়া।
  • ঋতুস্রাবের সমস্যা।

থাইরয়েড এমন একটি সমস্যা যা কখনো পুরোপুরি ভালো হয়না, তবে কিছু পদ্ধতি এবং খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা ঠিক রাখার মাধ্যমে থাইরয়েড কে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

থাইরয়েড টেস্ট রিপোর্ট

থাইরয়েড কমানোর উপায় অবলম্বন এর সাথে পরীক্ষা নিরীক্ষা জরুরী। থাইরয়েড টেস্ট রিপোর্টে থাইরয়েড গ্রন্থির কাজের গুণগত অবস্থা এবং সাধারণ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর তথ্য থাকে। টেস্ট সাধারণত থাইরয়েড হরমোনের (থাইরয়েড হরমোন বা TSH) মাত্রা পরীক্ষা করে করা হয়। এটি ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে করা হয় এবং সাধারণত সকালে খালি পেটে সংগ্রহ করা হয়। 

এছাড়াও, অন্যান্য থাইরয়েড হরমোনের (এটিতে টি৩ এবং টি৪) মাত্রা এবং থাইরয়েড অ্যান্টিবডির পরীক্ষা ও থাইরয়েড গ্রন্থির ছবি প্রদর্শনের জন্য আরও টেস্ট প্রয়োজন হতে পারে। এই রিপোর্ট থাইরয়েড অবস্থার উপর ভিত্তি করে ডাক্তার থাইরয়েড সমস্যার নির্দেশ এবং চিকিৎসা পরামর্শ দেয়।

থাইরয়েড রোগীর খাবার তালিকা

থাইরয়েড কমানোর উপায় এর থাইরয়েড রোগীর খাবার তালিকা সঠিক করতে হবে। 

পুষ্টি উপাদান
  • আয়োডিন: থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনের জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। সমুদ্রের মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ আয়োডিনের ভালো উৎস।
  • সেলেনিয়াম: সেলেনিয়াম থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে। বাদাম, বীজ, মাংস, মাছ, এবং শস্যের কিছু প্রকারে সেলেনিয়াম পাওয়া যায়।
  • জিঙ্ক: জিঙ্ক থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন ও বিপাকের জন্য প্রয়োজনীয়। মাংস, শেলফিশ, ডাল, বাদাম, এবং বীজে জিঙ্ক পাওয়া যায়।
  • ভিটামিন বি: ভিটামিন বি জটিল থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। মাংস, মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, শস্য, এবং শাকসবজিতে ভিটামিন বি পাওয়া যায়।
  • স্বাস্থ্যকর চর্বি: অসম্পৃক্ত চর্বি, যেমন জলপাই তেল, বাদাম তেল, এবং অ্যাভোকাডো, থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
  • ফাইবার: ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, যেমন শাকসবজি, ফল, এবং গোটা শস্য, হজম উন্নত করতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
খাবারের তালিকা
  • ফল: আপেল, কলা, নাশপাতি, আঙ্গুর, জাম্বুরা, বেরি
  • শাকসবজি: পালং শাক, শসা, ব্রকলি, গাজর, ফুলকপি, লাউ, বীট 
  • মাংস, মাছ, এবং ডিম: মুরগির মাংস, মাছ (সামুদ্রিক মাছ বিশেষ করে ভালো), ডিম
  • দুগ্ধজাত খাবার: দুধ, দই, পনির, 
  • শস্য: ভাত, ওটমিল, বাদামী চাল, গমের রুটি
  • বাদাম ও বীজ: বাদাম, আখরোট, সূর্যমুখী বীজ, তিসি বীজ
  • অন্যান্য: আয়োডিনযুক্ত লবণ, জলপাই তেল, অ্যাভোকাডো

থাইরয়েড কমানোর ঘরোয়া উপায়

থাইরয়েড কমানোর উপায় হিসেবে কিছু ঘরোয়া উপায় যা থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

  • আয়োডিনযুক্ত খাবার গ্রহণ: আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। সমুদ্রের মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ আয়োডিনের ভালো উৎস।
  • সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ: বাদাম, বীজ, মাংস, মাছ, এবং শস্যের কিছু প্রকারে সেলেনিয়াম পাওয়া যায়।
  • জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ: মাংস, শেলফিশ, ডাল, বাদাম, এবং বীজে জিঙ্ক পাওয়া যায়।
  • ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ: মাংস, মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, শস্য, এবং শাকসবজিতে ভিটামিন বি পাওয়া যায়।
  • স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ: অসম্পৃক্ত চর্বি, যেমন জলপাই তেল, বাদাম তেল, এবং অ্যাভোকাডো, থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
  • ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ: শাকসবজি, ফল, এবং গোটা শস্য হজম উন্নত করতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, মিষ্টি পানীয়, এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা।

থাইরয়েড রোগের ঔষধ

থাইরয়েড কমানোর উপায় এর সাথে ঔষধ সম্পর্কে জানতে হবে। থাইরয়েড রোগের চিকিৎসার জন্য কিছু ঔষধ হলো-

থাইরয়েড হরমোন স্তর নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করার জন্য:

   – লিভথাইরক্সিন (Levothyroxine): এটি সাধারণত থাইরয়েড হরমোনের অধিকতম ঔষধ।

   – লিওথাইরক্সিন (Liothyronine): কিছু ব্যক্তিদের জন্য এটি প্রয়োজন হতে পারে যখন লিভথাইরক্সিন প্রভাবশীল নয়।

অতিরিক্ত লোথাইরক্সিন স্তর নির্মূলে ব্যবহৃত হতে পারে:

   – মেথিমাজোল (Methimazole): হাইপারথাইরয়েডিজম চিকিৎসার জন্য এই ঔষধটি ব্যবহৃত হতে পারে।

হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য অন্যান্য ঔষধগুলি:

   – প্রোপ্রানোলোল (Propranolol): অনেকে এটি থাইরয়েড সংক্রান্ত লক্ষণ যেমন হার্টবিট বা ত্রুটি এবং অ্যাংজাইটিজম মোকাবিলায় ব্যবহার করেন।

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করার জন্য আপনার ডাক্তারের সাথে পরার্মশ করা উচিত। তারা আপনার অবস্থা ও অনুভূতির উপর ভিত্তি করে আপনার জন্য সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে সহায়তা করতে পারেন।

পরিশেষে

থাইরয়েড সমস্যা নানা কারণে হতে পারে। সেজন্য থাইরয়েড কমানোর উপায় সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। কারণ এটা গুরুত্বর না হলেও অবহেলার কারণে গুরুত্বর আকার ধারণ করতে পারে। থাইরয়েড লক্ষণ প্রকাশ পেলেই চিকিৎসকের সরণাপন্ন হতে হবে সেই সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তাছাড়ও কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করতে হবে, যাতে সমস্যা বৃদ্ধি না পায়। আশা করি থাইরয়েড কমানোর উপায় সম্পর্কিত বিস্তারিত বোঝাতে পেরেছি। ধন্যবাদ।

থাইরয়েড কমানোর উপায় সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর / FAQ

১। TSH বেশি হলে কি সমস্যা হয়?

উত্তরঃ উপসর্গ: শরীরে থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন– ওজন হ্রাস, অতিরিক্ত ঘাম নিঃসরণ, গরম সহ্য করার ক্ষমতা হ্রাস, বুক ধড়ফড় ইত্যাদি। এতে আক্রান্ত রোগীরা থাকে অস্থির প্রকৃতির, অতিসংবেদনশীল, খিটখিটে মেজাজের। তাদের হাতে কাঁপুনি শুরু হয়, নাড়ির গতি বেড়ে যায়।

২। থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা কত?

উত্তরঃ থাইরয়েড পরীক্ষা বা TSH পরীক্ষার জন্য স্বাভাবিক মাত্রা:

  • প্রথম ত্রৈমাসিক: 0.3-5 mIU/L.
  • দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক: 0.3-6 mIU/L.
  • তৃতীয় ত্রৈমাসিক: 0.7-2 mIU/L.

৩। থাইরয়েড হলে কি মোটা হয়?

উত্তরঃ থাইরয়েড হলে বিপাকীয় হার কিছুটা কমে যায়। ফলে হজমের গন্ডগোলের মতো কিছু কারণে ওজন বাড়তে থাকে। থাইরয়েডে ভুগলে ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু একেবারে অসম্ভবও নয় তা। কয়েকটি উপায় মেনে চললে থাইরয়েড থাকা সত্ত্বেও ওজন কমানো সহজ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন-

লিচুর উপকারিতা ও লিচু খাওয়ার পূর্বসতর্কতা

Leave a Comment