শীতকালে ত্বকের যত্ন ঘরোয়া উপায়

শীতকালে ত্বকের যত্ন

শীতেই মানুষের ত্বকের সমস্যা গুলো আংশিক বেড়ে যায়। কিন্তু সকলে জানেনা শীতকালে ত্বকের যত্ন ঘরোয়া উপায় । বর্তমানে প্রায় সারা বছর জুড়েই মানুষের ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে।  তাই বলা চলে ত্বকের সমস্যা সারা বছর জুড়েই থাকে। আর যাদের সারা বছর জুড়ে ত্বকের সমস্যা থাকে তুলনামূলক শীতে তা  আরো বেড়ে যায়।

মূলত  যে দেশে আপনি বাস করে সেই দেশের আবহাওয়া এবং জলবায়ুর উপর ভিত্তি করেই  ঘরে উঠবে আপনার শরীরের আদ্রতা। সে ক্ষেত্রে দেখা যায় ত্বক যেমনই হোক শুষ্ক তৈলাক্ত স্বাভাবিক মিশ্র সমস্যা আপনার দেখা দিবেন। পুরো বছর জুড়ে এই সমস্যাগুলো থাকলেও শীতে বেশি লক্ষনীয় হয়ে ওঠে,

কারণ শীতের আবহাওয়া শুষ্ক হওয়াতে ত্বকের উপরের স্তর এপিডারমিসে পানির পরিমাণ কমে গিয়ে শুষ্কতা বেড়ে যায় ত্বকের।  সাধারণত শীতে আমরা পানি কিছুটা কমই খাই, আর এই কারনেই আমাদের শরীরে পানি পরিমান কমে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেয় আমাদের ত্বকে। যার ফলে ত্বক আরও শুষ্ক হতে থাকে। 

এই শুষ্ক  ত্বকে আর্দ্রতায়  রূপান্তর করতে না পারলেই শুরু হয় সমস্যা। শীতে তৈরি হওয়া যে ধরনের সমস্যার কথা জানালেন বিশেষজ্ঞরা শুষ্কতা, সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি ইত্যাদি কারন গুলোর উপর ভিত্তি করে ।  সাথে বলে দিলেন শীতকালে ত্বকের যত্ন এর কিছু পরামর্শ। একে একে আলোচনা করা যাক বিষয়গুলো নিয়ে।

শীতকালে মুখের ত্বকের যত্ন

শরীর থেকে চামড়া ওঠা, হাত-পা ফেটে যাওয়া ,ঠোঁট ফেটে যাওয়া ,মাথায় প্রচন্ড খুশকি হওয়ার এই সময়ের কিছু  সাধারণ সমস্যা। আয়ুর্বেদিক রূপবিশেষজ্ঞ রাহিমা সুলতানা জানালেন তৈলাক্ত ত্বক এই সময়ে বেশ ভালো থাকলেও শুষ্কতার সমস্যায় অনেকেই পরে।  অনেক বেশি পানি পান করা এবং ত্বক যাতে সব সময় আদ্রতা থাকে এদিকে নজর রাখা  এই সমস্যার সমাধান। 

যাদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক তারা তেল আছে বা ভারী ক্রিম আছে এমন মশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত, তবে যাদের ত্বক তৈলাক্ত তারা এই মশ্চারাইজার না ব্যবহার করাই ভালো।  যাদের ত্বক তৈলাক্ত তারা হালকা মশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।  মশ্চারাইজার ব্যবহারের পূর্বে সবসময় খেয়াল রাখতে হবে চেহারা, গলা বা  শরীরের যে স্থানে  আপনি মশ্চারাইজার ব্যবহার করছেন তা ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

জলপাই তেল ,গোলাপজল, গ্লিসারিন সমপরিমাণে মিশিয়ে একটি বোতলে সংরক্ষণ করতে পারেন আপনার শরীরে ব্যবহারের জন্য এটি শরীরের জন্য বেশ উপকারী। ত্বক বেশি শুষ্ক হয়ে উঠলে এটি ব্যবহার করতে পারেন।

ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার আরো একটি সমাধান জানালেন রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি ।  তিনি বললেন প্রতিদিন গোসল করলে ত্বকের আদ্রতা বজায় থাকে।  দিনে কয়েকবার হাত মুখ ধুতে হবে।  দিনে কয়েকবার হাত মুখ ধোয়ার ফলে সেই স্থানগুলো পানির ছোঁয়া পাবে। 

এভাবেও ত্বকের আদ্রতা কে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।  যে সাবান ব্যবহার করুন না কেন নিশ্চিত করুন তাতে ক্রিম এর পরিমাণ বেশি থাকে। ক্ষারযুক্ত সাবান শীতের কিছুদিন চলায় উত্তম। তাহলে শীতকালে ত্বকের যত্ন ভালো রাখা সম্ভব।

শীতে ত্বকের যত্ন

সারা বছর আমরা রোদ কে উপেক্ষা করলেও শীতের সময় রোদের তাপ বেশ আরামদায়ক।  আর এই সময়ে ত্বক পুড়ে যায় রোদের তাপে। সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি সরাসরি ত্বকের উপর প্রভাব ফেলে।  তবে এই সময় সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে  ত্বক পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাবে।  আর তারপরেও যদি কোনো কারণে ত্বক পুড়ে যায় তাহলে ডাবের পানি দিন এতে রোদে পোড়া কালো দাগ কমে যাবে। 

ডাবের পানি বরফ এর কিউব পানীয় ব্যবহার করতে পারেন।  ডাবের পানির আরেকটি ব্যবহার হলো বেসনের সাথে ডাবের পানি পেস্ট তৈরি করে লাগানো।  পেজ টি বানানোর পরে অবশ্যই ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপরে চেহারা বা  যে স্থান রোদে পুড়ে গেছে সেখানে লাগান।  মিশ্রণটি শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, তারপর আলতো ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন।

রোদে পোড়া মুখের রং একেক জায়গায় একেক রকম হতে পারে, যেমন কপাল, গাল, চোখের নিচে এবং থুতনি।  কোথাও পোড়া ভাব বেশি বোঝা যায় আবার কোথাও পোড়া ভাব থাকে না।  এক্ষেত্রে আধা চা চামচ মধু, সিকি চা চামচ দুধ, ১ চা-চামচ আলুর রস,  ১ চা চামচ বেসন মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করতে পারেন।  দুধের বদলে টক দই ব্যবহার করতে পারেন যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত। 

খুব প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম  ও মিনারেল পাওয়া যায় ডাবের পানিতে,  প্রাকৃতিক ব্লিচ এ ভরপুর  আলু, টমেটোতে রয়েছে প্রাকৃতিক ব্লিচ, লাইকোপিন,  এবং ভিটামিন সি  যা শুষ্ক ত্বকের জন্য বেশ উপকারী।  এজন্যই এই প্যাকটি হয়ে উঠতে পারে শীতকালে ত্বকের যত্ন আপনার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার একটি উপায়। 

আরও পড়ুনঃ এলোভেরার উপকারিতা

শীতে ত্বকের নানা রকম এলার্জি লক্ষ করা যায়

যাদের ত্বকে এলার্জি আছে শীতের সময় এই এলার্জি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।  শীতের সময় উল্লেখযোগ্য কিছু ত্বকের সমস্যা হল সোরিয়াসিস, অ্যাকজিমা, দাদ, উইন্টার র‌্যাশ ইত্যাদি ।  অনেকের ক্ষেত্রে শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সোরিয়াসিস।  পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে হতে পারে অ্যাকজিমা।  অ্যাকজিমা আক্রান্ত স্থানটি বেশ পুরু এবং শক্ত হয়ে ওঠে এবং সেই স্থানটি চুলকায়ও।

অনেকের আবার মুখে গুটি গুটি উঠে ভরে যায়।  চাকা চাকা হয়ে ত্বক ফুলে ওঠে অনেকের।  শীতের পোশাক যেমন উল এর পোশাক পরার কারণেও অনেকের শরীরে দাদ হয়।  শরীরে বিভিন্ন ভাঁজ পড়া স্থানগুলোতে অনেক সময় আলগা একটা ত্বকের তৈরি হয়। এ ধরনের সমস্যা আসলে বলে শেষ করা যাবে না।  সমস্যা যখন আছে তখন তার সমাধানও আছে,  কিছু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আজকে কিছু সমাধান তুলে ধরবো। 

এই সমস্যা গুলোর অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে শুষ্কতা। আমরা প্রতি বছরের তিন মাস ভিটামিন  ঔষধ খাই এই ভিটামিনটি শীত হওয়াটাই উত্তম।  ভিটামিন এ বি ও সি পরিপূর্ণ খাবার খাওয়া উত্তম, তবে কোনভাবে যদি এ ধরনের খাবার না খেতে পারি তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ট্যাবলেট নিতে হবে। যাদের শরীরের র‌্যাশের সমস্যা আছে তারা জলপাই তেল অল্প পানিতে মিশিয়ে ত্বকে লাগাতে পারেন।

ত্বকের ভিতরে অতি সহজেই প্রবেশ করতে পারে এই জন্যই পানির সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা উত্তম। ভেজলিন বেশ ভালো কাজ করে আলগা ত্বকের জন্য।  তেলের সাথে কিছুটা গ্লিসারিন মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।  যাদের শরীর সোরিয়াসিসে আক্রান্ত তারা এক বালতি পানিতে এক চামচ  ফিটকারি এক চামচ গোলাপজল মিশিয়ে গোসল করতে পারেন।  আশাকরি উপকার পাবেন জানালেন শারমিন কচি। 

মৃত কোষ সমস্যার সমাধান

এসময়ের লক্ষনীয় বিষয় গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মৃত কোষ।  অন্তত সপ্তাহে একদিন  স্ক্রাব করলে এই সমস্যা থেকে সমাধান পাওয়া সম্ভব। স্ক্রাব ব্যবহারের পরে  তকে যদি কোনো সমস্যা বোধ করেন তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন।

শীতে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে আপনার পা এবং ঠোঁট? চলুন জেনে নেই এই সমস্যার কিছু সমাধান

এখন লক্ষ করা যায় পুরো বছর জুড়ে ঠোঁট ফাটা সমস্যাটি থাকে।  অনেকের আবার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয়।  এক্ষেত্রে গ্লিসারিন আপনাকে অনেকটা সহায়তা করবে।  ভালো কাজ করবে ভ্যাসলিন পা ফাটার ক্ষেত্রে। চাইলে গ্লিসারিন এবং ভ্যাসলিন একসাথে মিশিয়ে ঠোঁটে লাগাতে পারেন।  

শীতকালে ত্বকের যত্ন ঘরোয়া উপায়

বিভিন্ন রকমের সমস্যা দেখা দেয় শীতের রুক্ষতায়।  সবারই উচিত এই সময়ে ত্বকের কিছু এক্সট্রা যত্ন নেওয়া।  এক্সট্রা যত্ন না নিলে ত্বকের শুষ্কতা আরো বাড়বে ।  তাই ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার আগেই কিছু উপায় অবলম্বন করলে এই শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। চলুন জেনে নিই কিছু উপায় যেভাবে আপনি আপনার ত্বকের যত্ন নিতে পারেন

  1. দই আর মধু এই ক্ষেত্রে বেশ উপকারী – আপনার ত্বকের আর্দ্রতা ফিরে পাওয়ার জন্য দই আর মধু একসাথে মিশিয়ে  ১০-১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখুন এরপর ধুয়ে ফেলুন।
  2. ত্বকের যত্নে অ্যালোভেরা জেল- আদ্রতা বজায় রাখতে  তাজা অ্যালোভেরা জেলের মধ্যে ভিটামিন ই তেল কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
  3. ত্বকের যত্নে দুধ আর মধু –  গোসলের আগে দুধ আর মধু মিশিয়ে সারা শরিলে ১০  মিনিটের মত মাখিয়ে রাখুন তারপর সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন, এটি আপনার ত্বকের যত্নে ম্যাজিকের মতো কাজ করবে ত্বকের আর্দ্রতা গুণ বাড়িয়ে দেবে ।
  4. ওটমিলের সাহায্যে ত্বক পরিচর্যা- ত্বক পরিচর্যার অন্যতম উপকরণ হচ্ছে ওটমিল।  ভালো করে ওটমিল গুঁড়া করে নিয়ে গোলাপ জলের সাথে এক চামচ ওটমিল মিশিয়ে গোসলের আগে পুরা শরীরে লাগিয়ে রাখুন ১০ মিনিট, এরপর ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। টানা এক সপ্তাহ ওটমিল ব্যবহার করতে পারলে নিজেই বুঝতে পারবেন আপনার ত্বকের পরিবর্তন।
  5. অলিভ অয়েল এবং চিনির উপকারিতা–  অলিভ অয়েল এবং  চিনি একসাথে দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন, অলিভ অয়েল আপনার ত্বকের আর্দ্রতা  রাখবে এবং তিনি স্ক্রাবের কাজ করবে ৷ দুই চাচা মিস অলিভ অয়েল ও  চিনির মিশ্রণটি পুরো শরীরে লাগিয়ে হালকা ম্যাসাজ করুন ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন ।  দিনে অন্তত দুইবার আপনি এটি ব্যবহার করতে পারেন৷

আরও কিছু শীতকালে ত্বকের যত্ন

  1. ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পাকা কলা-  অলিভ অয়েলের সঙ্গে পাকা কলা এবং মধু ভালো করে মিশিয়ে নিন৷ খুব আলতো হাতে কিছুক্ষণ মাসাজ করুন তারপর উষ্ণ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  2. ত্বকের যত্নে চকলেট এর ব্যবহার – চকলেটে আছে ক্যাফেইন যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে।  চকলেটের সাথে কয়েক ফোঁটা মধু মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করে নিন এবং তা মুখে  এবং ব্যবহার করুন। ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন এরপর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। মুখের পানি শুকিয়ে যেকোনো মশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
  3. ত্বকের যত্নে কমলা লেবুর ব্যবহার- প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি আছে কমলালেবুতে যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। শীতে প্রচুর পরিমাণ কমলালেবু পাওয়া যায় আমরা কমলালেবু খেয়ে এর   ছাল না ফেলে দিয়ে শুকিয়ে গুড়ো করে  তা  ত্বকে ব্যবহার করতে পারি। এই গুঁড়োর সাথে মধু অথবা এলোভেরা জেল ব্যবহার করা উত্তম। 
  4. ত্বকের যত্নে নারিকেল তেলের ব্যবহার- শীতকালে মুখের পাশাপাশি গোড়ালি, হাটু, হাতের কনুই এর ও বিশেষ খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এগুলির যত্ন না নিলে দিনদিন রুক্ষ শুষ্ক এবং কালো বর্ণ ধারণ করবে। প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই সব স্থানে নারিকেল তেল লাগিয়ে ১০ মিনিট ম্যাসাজ করুন এরপর পার্থক্যটা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন ।
  5. ত্বকের যত্নে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উত্তম গ্লিসারিন – সাধারণত শুষ্ক ত্বকের জন্য উপকারী একটি জিনিস। ১ চা চামচ গ্লিসারিন এবং ২ চা চামচ গোলাপ জলের সাথে মিশিয়ে শীতের দিনে ত্বকে ব্যবহার করুন। এটি মশ্চারাইজার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, আশা করি উপকার পাবেন।

আশাকরি আমাদের এই কনটেন্টটি আপনার বেশ উপকারে আসবে, সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন আপনার সুস্থতাই একান্ত কাম্য

আরও পড়ুন-

থানকুনি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা

শীতে চুলের যত্ন ও করণীয়

Leave a Comment