আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা apple sider vinegar khwyar niom o upokarita

আপেল সিডার ভিনেগার

স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন মানুষদের মাঝে অনেক পরিচিত এবং জনপ্রিয় একটি টনিকের নাম হল আপেল সিডার ভিনেগার । স্বল্প মূল্যে সহজ লভ্য এই দ্রব্যটি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় পানীয়তে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে মানুষ এই তরল দ্রব্যটি স্বাস্থ্য রক্ষা ও রান্না বান্নার কাজে ব্যবহার করে আসছে।

চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক জনপ্রিয় এ দ্রব্য সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য ও খাওয়ার নিয়ম 

ভিনেগার কি

ফরাসী শব্দ থেকে উদ্ভুত হওয়া ”ভিনেগার “ শব্দটির মানে হচ্ছে Sour wine অর্থাৎ টক স্বাদ বিশিষ্ট ওয়াইন । সোজা ভাষায় বলতে গেলে আপেল সিডার ভিনেগার হচ্ছে এমন এক ধরনের ভিনেগার যা আপেল থেকে তৈরীকৃত। যা মূলত ভিজিয়ে রাখা আপেলের রস থেকে তৈরী করা হয় । এটি তৈরীর সময় ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয় । এটি অম্ল জাতীয় তরল পদার্থ যাতে ৩% অ্যাসিডিটি বিদ্যমান রয়েছে ।

ফার্মেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ায় আপেলের শর্করাযুক্ত দানা ভেঙে ফেলে একে অ্যালকোহলে রূপান্তর করা হয় এবং তারপর এতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরীর জন্য Acetobacter নামক ব্যাকটেরিয়া তৈরী করা হয় । এর পর ম্যালিক অ্যাসিড ও এসিটিক অ্যাসিড দুটি মিলিত করে একে ভিনেগারের স্বাদ দেওয়া হয়।


আরও পড়ুনঃ কলা খাওয়ার উপকারিতা


আপেল সিডার ভিনেগার কোনটা ভালো

উপাদান এবং তৈরী প্রণালীর ওপর নির্ভর করে বেশ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে এবং আপেল সিডার ভিনেগার কোনটা ভালো সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :

 ১.ফিল্টারড আপেল সিডার ভিনেগার 

এনজাইম এবং প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া তে পরিপূর্ণ এই ভিনেগারকে ছেঁকে বিশুদ্ধ করে লিকুইডে পরিণত করা হয় । এই ভিনেগার দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার । আর এটি আনেক পাতলা ঘনত্বের হয় ।

এই  ভিনেগারে পুষ্টিকর এনজাইমের পরিমাণ অনেক কম এবং পাশাপাশি এটি তু্লনামূলক ভাবে দামে সস্তা ।

২.আপেল সিডার ভিনেগার উইথ দ্যা মাদার

সব ধরণের আপেল সিডার ভিনেগারে মধ্যে এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় । এখন সাধারণ ভাবেই একজনের মনে এই উইথ দ্যা মাদার সম্পর্কে জানার ইচ্ছা জাগবে ।

অনেক সময় আপেল সিডার ভিনেগার এর গাঁজন প্রক্রিয়াটির সময়কাল বাড়ানো হয়ে থাকে । সে সময় এই ভিনেগারে বেশ কিছু ভালো গুণ সম্পন্ন এনজাইম, এসিটিক এসিড ও ব্যাকটেরিয়া থেকেই  যায় । এই সব রকম উপাদানকে একত্রে মাদার বলা হয় ।

এতে প্রোবায়োটিক এর মতো কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে এবং এনজাইম রয়েছে যেটি খাদ্যকণাকে ভাঙতে কাজ করে যেটি  শরীরে মেটাবলিজমের হার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ।

যারা এই ভিনেগারটি  নিয়মিত গ্রহণ করে তারা এতে সামান্য ভিন্নতা লক্ষ করতে পারে । এটি ঘনত্বে গাঢ় বা ঘন এবং বর্ণে অস্বচ্ছ  ও ঘোলা হয় ।

৩. অরগ্যানিক আপেল সিডার ভিনেগা

এই ধরনের আপেল সিডার ভিনেগারে অজৈব পদার্থের বিদ্যমানতা নেই এবং পাশাপাশি এতে কোন ধরনের  রাসায়নিক উপকরণ উপস্থিতি নেই । এই কারণে এটির গ্রহণযোগ্যতা বেশি ।

৪. অপাস্তুরাইজড আপেল সিডার ভিনেগার 

অপাস্তুরাইজড আপেল সিডার ভিনেগারে উচ্চ তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পাস্তুরাইজেশন করা হয় না । যে কারণে এতে আগে থেকে বিদ্যমান থাকা উপকারী এনজাইম ও ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকেই যায় । এ জন্য যে কোনো বয়সী  মানুষের জন্য এই প্রক্রিয়ায় তৈরি ভিনেগারটি বেশ উপকারী ।

৫. র’ বা কাঁচা আপেল সিডার ভিনেগার 

র’ বা কাঁচা আপেল সিডার ভিনেগারটি তৈরীর সময় পরিস্রাবণ  ও পাস্তুরাইজেশন এর মতো কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় না । আর এটিতে স্বাদের পরিবর্তন করার জন্য কোনো ধরনের রাসায়নিক উপাদানও মেশানো হয় না ।

৬. আনফিল্টারড আপেল সিডার ভিনেগার 

আনফিল্টারড এই আপেল সিডার ভিনেগারকে আরও স্বচ্ছতার সাথে ভিনেগার তৈরি করার মতো উদ্দেশ্যে ছেঁকে বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। এটি থেকে ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেন আউট  করা  হয়  না এবং এতে গাঁজন প্রক্রিয়া চলমান থাকে । তবে এতে অম্লতা এবং স্বাদের পরিবর্তন হতে পারে।

আপেল সিডার ভিনেগার এর উপকারিতা

ষ্বাস্থ্য রক্ষায় আপেল সিডার ভিনেগার অতুলনীয় উপকারি একটি জিনিস । চলুন তাহলে এর উপকারি দিক গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক :

১. ডায়বেটিস বা মধুমেহ নিয়ন্ত্রণ

আপেল সিডার ভিনেগার সাধারন মানুষসহ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত সকলের জন্য বেশ উপকারি একটি দ্রব্য । কিছু রিসার্চে দেখা গেছে, যে সব মানুষ  রাতে ঘুমানোর কিছু সময় আগে সামান্য পরিমাণ (১ অথবা ২ টেবিল চামচ )  গ্রহণ করে সকাল বেলা তাদের রক্তে শর্করার বেড়ে যাওয়ার গতি তুলনামূলক চার শতাংশ কমে যায় ।

তাই ডায়াবেটিস নেই এমন মানুষও তাদের  রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে রাতে ঘুমানোর আগে সামান্য পরিমাণ আপেল সিডার ভিনেগার গ্রহণের অভ্যাস করতে পারেন ।কিন্তু যারা বর্তমানে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ খাওয়া শুরু করেছেন বা আগে থেকেই খাচ্ছেন তারা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া  কখনোই গ্রহণ করবেন না ।

২. ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণ

যারা ওবেসিটি  বা স্থূলতা সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য এটি বিশেষ ভাবে উপকারি । আপেল সিডার ভিনেগারে রয়েছে অ্যাসিটিক অ্যাসিড এবং এটি খাওয়ার ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে সাহায্য করে পাশাপাশি  মেটাবলিজমও বাড়ায়। এই জন্য স্থূলতা সমস্যায় ভুক্তভুগি কেউ যদি নিয়মিত খাবার পরে এটি গ্রহণ করে তাহলে সহজেই সে ওজন কমাতে পারবে ।

৩.কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

এটি গ্রহণের ফলে স্বাভাবিক ভাবেই  রক্তে কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমে আসে । জাপানের একটি গবেষণার জরিপে দেখা গেছে যে, অ্যাসিটিক অ্যাসিড রক্ত থেকে খারাপ কোলেস্টেরল ধ্বংস করে ফেলতে সাহায্য করে ।

৪. হজম শক্তি বাড়ায়

এই  ভিনেগারে রয়েছে পাকস্থলীর এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এই ভিনেগার আমাদের অন্ত্রে পেপসিন নামক এনজইম তৈরীর মাত্রা বাড়ায় যা প্রোটিন জাতীয় খাবার তাড়াতাড়ি পরিপাক করতে সাহায্য করে।

৫.খারাপ ব্যাকটোরিয়া ধ্বংস করে

আপেল সিডার E.Coil এর মতো খারাপ  ব্যাকটোরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে । আর ঠিক এই কারণেই প্রাচীন সময়েও বিভিন্ন রকম খাদ্য সংরক্ষণে এটি ব্যবহার করা হতো ।

এই উপকারিতাগুলো জানার পর অবশ্যই জানতে ইচ্ছে করবে যে আপেল সিডার ভিনেগার আসলে কিভাবে বা কি নিয়মে খেতে হয় । তাই  খাওয়ার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো :

আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম

আপেল সিডার ভিনেগার বিভিন্ন ভাবেই খাওয়া যায় । তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এর ব্যবহারের ধরন ও পরিমাণে পরিবর্তন আনা হয় । সাধারণত বিভিন্ন ধরনের রান্নায় , আচার সংরক্ষরণে এটি  ব্যবহার করা হয় । তবে কেউ যদি তার প্রয়োজনে খাবারে ছাড়াই এটি গ্রহণ করতে চায় তাহলে এক গ্লাস উষ্ণ গরম পানিতে ১ বা ২ টেবিল চামচ (৫ থেকে ১০ মিলিলিটার)  ভিনেগার মিশিয়ে গ্রহণ করতে পারে ।

শেষকথা

আপেল সিডার ভিনেগারে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে শরীরে কোনো জটিল সমস্যা সৃাষ্ট হয় না । কিন্তু তবুও এ বিষয় সম্পর্কে জেনে রাখ উচিত । কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলো হলো :

  • বেশি সময় ধরে এটি গ্রহণের ফলে শরীরে পটাসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে ।
  • প্রয়োজনের বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।
  • এসিডিটির রোগীরা এটি বেশিদিন যাবৎ গ্রহণ করলে আলসারের মতো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
  • গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ কি না সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায় নি । এ কারণে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের এটি এড়িয়ে চলাই উত্তম ।

এই ভিনেগার জিনিসটি ভালো হলেও তার কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। এজন্য এটি নিয়মিত ভাবে গ্রহণ করার পূর্বে অবশ্যই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে জানুন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিন।

 

আরও পড়ুন-

কমলা খাওয়ার উপকারিতা

মধু খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।